সর্বশেষ খবর:

[মতামত] আইনমন্ত্রী কাকে আইন দেখাচ্ছেন?

মশিউল আলম: সাংবাদিক
(প্রথম আলো থেকে )

গত বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, বিএনপি হরতাল-অবরোধের নামে সন্ত্রাস করছে। দেশে সন্ত্রাস দমন আইন আছে। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সেই আইন প্রয়োগ করা হবে।
আইনমন্ত্রী আইন প্রয়োগের কথা বলবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অবরোধ-হরতালের কারণে দেশজুড়ে যে সন্ত্রাসময় পরিবেশের উদ্ভব ঘটেছে, শুধু সন্ত্রাস দমন আইন কেন, দেশের সব আইন ও কালাকানুন প্রয়োগ করেও কি তা থেকে উত্তরণ সম্ভব?
সম্ভব নয়। কারণ এটা কোনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিগত সংকট নয়। এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। আইনের প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগের মাধ্যমে যদি রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান ঘটত, তাহলে অনেক আগেই এ দেশে অনাবিল শান্তি নেমে আসত। কারণ, বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকেই আইনের ব্যাপক প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ চালানো হচ্ছে। তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার পরিবর্তে তাদের নেতা-কর্মীদের পাইকারি হারে গ্রেপ্তার করা, ডজন ডজন মামলা দায়ের করা সরকারের নৈমিত্তিক চর্চায় পরিণত হয়েছে। বিরোধী দলগুলো মিছিল, সভা, সমাবেশ করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করলে জননিরাপত্তার আইন দেখিয়ে তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। তারা মিছিল বের করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি দলের মাস্তান বাহিনী যৌথভাবে তাদের ওপর হামলা চালায়।
আর এখন বিরোধীদলীয় নেতাদের বাড়িতে গুলি করা হচ্ছে, বোমা মারা হচ্ছে। আইনমন্ত্রীর বিবেচনায় এসব কি সন্ত্রাস নয়? তাহলে যারা এসব করছে, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে না কেন? কেন শুধু বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগের হুমকি দেওয়া হচ্ছে?
বিএনপিসহ বিরোধী জোটের অবরোধে যেসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও নৈরাজ্য-নাশকতা চলছে, রাজনৈতিক অধিকারের দোহাই দিয়ে সেগুলোকে জায়েজ করা যাবে না। বিরোধী দলগুলো এমন কথা বলে পার পাবে না যে সন্ত্রাস-নাশকতা তারা করছে না। কর্মসূচি যেহেতু তাদের, তাই তা যেন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রধানত তাদেরই। যদি এমন হয় যে তাদের ডাকা অবরোধের নিয়ন্ত্রণ তাদের নিজেদের হাতেই নেই, ঘোলা জলে মাছ শিকার করতে চাইছে অন্যান্য মহল, তাহলে এই ধরনের কর্মসূচি তাদের দেওয়াই উচিত নয়।
মূল সমস্যা হলো বল প্রয়োগ বা জবরদস্তি। সরকার গোড়া থেকে বিরোধী দলগুলোর ওপর জবরদস্তি চালিয়ে যাচ্ছে বলে আজ এই সংকটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কী এমন ক্ষতি হতো বিরোধী দলগুলোকে ৫ জানুয়ারি ঢাকায় সমাবেশ করার অনুমতি দিলে? কী সমস্যা হতো খালেদা জিয়াকে গুলশান কার্যালয় থেকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলে? তাদের জনসভা ‘সাফল্যমণ্ডিত’ হতো—এই তো? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অনুশীলন তো এ রকমই হওয়া উচিত যে বিরোধী দলগুলো সফলভাবে সভা-সমাবেশ করবে, আর সভা-সমাবেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে সহযোগিতা করবে সরকার। কিন্তু তা না করে উল্টোটা করার বিধান কোন আইনে লেখা আছে? জনশৃঙ্খলা আর জানমালের নিরাপত্তার বাধাবুলি শুনিয়ে সরকার দিনের পর দিন বিরোধী দলগুলোর সভা-সমাবেশ বানচাল করতে থাকলে সেটা হয় সীমাহীন জবরদস্তি, আর সব ধরনের জবরদস্তির বিপরীত প্রতিক্রিয়া হিসেবে আসে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, নাশকতা, নৃশংসতা।
হরতাল-অবরোধে যারা সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করছে, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইন প্রয়োগ করা হবে বলে আইনমন্ত্রী যে সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন, তা নিয়ে আপত্তি করা যায় কি না, সে সম্পর্কে এই নগণ্য নাগরিকের কোনো ধারণা নেই। সাধারণ বিবেচনা থেকেই বলা যায়, যে-ই সন্ত্রাস করবে, তার বিরুদ্ধেই সন্ত্রাস দমন আইন প্রয়োগ হোক (যদিও ক্ষমতাসীনেরা সন্ত্রাস করলে তাদের ক্ষেত্রে আইন কাজ করে না)। কিন্তু কোন আইনের বলে খালেদা জিয়াকে তাঁর গুলশানের কার্যালয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে অবরোধ করে রাখা হয়েছে? অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, খালেদা জিয়া অবরুদ্ধ নন, তিনি যেকোনো মুহূর্তে বাসায় যেতে পারেন। কিন্তু সরকার এমন কথা বলে কোন আইনের বলে? খালেদা জিয়া দুবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, দুবার সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন, দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন তিনি—এই সব পরিচয় বাদ দিয়ে শুধু এটুকুই যদি গণ্য করা হয় যে তিনি এই দেশের একজন পূর্ণবয়স্ক নাগরিক, তাহলে ‘বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধে চলাফেরা করার’ যে অধিকার এই প্রজাতন্ত্রের সংবিধান তাঁকে দিয়েছে, সরকার কোন আইনের বলে তাঁর সেই অধিকার খর্ব করছে? গুলশান কার্যালয় থেকে খালেদা জিয়াকে শুধু তাঁর বাসাতেই ফিরে যেতে হবে, অন্য কোথাও তিনি যেতে পারবেন না—এই জবরদস্তি তাঁর ওপর চালানো হচ্ছে কোন আইনের বলে?
    Blogger Comment
    Facebook Comment