সর্বশেষ খবর:

ঢাবিতে চলছে ‘ব্লেইম’ গেম রাজনীতি


ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, হলে সিট দখল, নিজ দলের কর্মী অথচ অন্য পক্ষের অনুসারী- এসব কারণে ‘ব্লেইম’গেম রাজনীতি খেলছেন বাংলাদেশের রাজনীতির সূতিকারগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারা।

১৯৯২ সাল থেকে ছাত্রশিবির বিশ্ববিদ্যালয়ে অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ। আর ছাত্রদল ২০১০ সালের পর থেকেই ক্যাম্পাস ছাড়া। নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, ছাত্রলীগের কঠোর অবস্থান ও প্রশাসনের অসহযোগীতায় তারা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারছে না।

ফলে কাউকে শিবির বা ছাত্রদল বানাতে পারলে সহজে ক্যাম্পাস ছাড়া করতে পারা যায়। এ নিয়ে ক্যাম্পাস জুড়ে চলছে ‘ব্লেইম’ গেম রাজনীতি। এক্ষেত্রে প্রশাসনও ছাত্রলীগকে সমর্থন করে।

সূত্র জানায়, হলগুলোতে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও হলে থাকছেন প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী। তাছাড়া ছাত্রনেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে হলগুলোতে দু’শতাধিক বহিরাগত অবস্থান করছে।

তীব্র সিট সংকট দেখা দেয় হলগুলোতে। ২০১৪-২০১৫ সেশনের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরাও ক্যাম্পাসে চলে আসে। রাজনীতি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এসব শিক্ষার্থীকে হলে তুলতে হবে। কিন্তু সিট খালি না থাকায় কোনভাবেই তাদের হলে তুলতে পারছেন না নেতারা।

তাই অপেক্ষাকৃত নিস্ক্রিয় শিক্ষার্থীদের ব্লেইম দিয়ে হল থেকে বের করে দিচ্ছে তারা। পাশাপাশি নতুন শিক্ষার্থীদের মাঝে শিবির-ছাত্রদল ভীতি তৈরী করার জন্যও এ পন্থা অবলম্বন করছে নেতারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে বিভিন্ন হল থেকে শতাধিক শিক্ষার্থীকে শিবির-ছাত্রদল করার অভিযোগে বের করে দেয়া হয়েছে। যাদেরকে বের করে দেয়া হয় তারা আর হলে উঠতে পারে না।

সর্বশেষ এই বছরের গত ১ ফেব্রুয়ারি রাত ২টায় জহুরুল হক হলে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আল নাহিয়ান খান জয় ও তার কর্মীরা শিবির আখ্যা দিয়ে নাসির, সাজ্জাদ, সাজ্জাদ হোসাইন, মামুন, ইকবাল, খালিদ এবং মাহবুবুর রহমান নামে ৭ শিক্ষার্থীকে মারধর করে শাহবাগ থানার পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

পরের দিন সন্ধ্যায় শাহবাগ থানার পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা সাইদুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর প্রফেসর ড. আমজাদ আলীকে তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তারা জানান, শিবিরের সাথে জড়িত থাকার ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

একই হলে গত ২১ জানুয়ারি একই ব্লেইম দিয়ে ৫ শিক্ষার্থীকে ব্যাপক মারধর করে ওই হলের সভাপতি রিফাত জামান গ্রুপের কর্মীরা। পরে শাহবাগ থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করলে ৪ জন সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে।

এর পরে ২৪ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে সাদিকুর রহমান নামে এক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান ব্যক্তিগত আক্রোশের জের ধরে শিবির-ছাত্রদল ব্লেইম দিয়ে ব্যাপক মারধর করে শাহবাগ থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গিয়ে ওই শিক্ষার্থীকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনে।

পরে জানা যায়, ওই ছাত্রলীগ নেতা মুহসীন হলের একটি সিঙ্গেল রুমে থাকতেন। তিন থেকে চার মাস আগে সিদ্ধান্ত নেন তিনি দু’জনের কক্ষে একাই থাকবেন। এর জন্য তিনি বেছে নেন হলের আবাসিক ছাত্র ব্যাবসায় শিক্ষা অনুষদের ৪র্থ বর্ষে সাদিকুর রহমানের ৫৪৪ নম্বর কক্ষ। ওই ছাত্রলীগ নেতা জোরপূর্বক সাদিকুরকে তার কক্ষ থেকে বের করে দেন।

গত ৩১ জানুয়ারি ব্যক্তিগত শত্রুতার জের ধরে এ এফ রহমান হলের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সোহাগ মিয়াকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আহত করে তার বন্ধু সনেট ও দুই সহযোগী। আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতলে ভর্তি করা হয়। হল সূত্রে জানা যায়, সোহাগ ও সনেট দু’জনই ছাত্রলীগের পদবিধারি নেতা।

মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ৪০৭ নম্বর কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান ও হাফিজুর রহমান। কক্ষের লাইট জ্বালোনোকে কেন্দ্র করে দু’জনের মধ্যে সর্ম্পকের ফাটল ধরে। ছোট ছোট ঘটনা থেকে তিক্ততা বাড়তে থাকে। হাফিজ হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম-সম্পাদক গাজী হাসিবের বন্ধু।

এ সর্ম্পক কাজে লাগিয়ে গত বছরের নভেম্বরে মিজানকে ‘শিবির’ বানানোর চেষ্টা চালায় হাফিজ। হাফিজের চাপে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মিজানের কক্ষে তল্লাশি করে। তবে শিবির করার কোন আলামত পায়নি তারা। তল্লাশি শেষে হাফিজ বলেন, ‘আমি তার (মিজান) টেবিলে তল্লাশি করি, দেখি কিছু পাই কিনা’।

এ সময় হাফিজ মিজানের টেবিলে তল্লাশি করে একটা বইয়ের ভিতর থেকে ‘শিবিরের সংবিধান’ নামে কিছু লিফলেট বের করে। ছাত্রলীগ নেতারা মিজানকে মারধর করে। পরে শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পেয়ে মিজানকে ছেড়ে দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

গত ৩ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার ছাত্রী হলে নামাজ কক্ষ থেকে তিন ছাত্রীকে আটক করে ছাত্রলীগ। পরে প্রশাসন তাদের হল থেকে বের করে দেয়।

প্রশাসন ও ছাত্রলীগের অভিযোগ, তারা ছাত্রীসংস্থা ও নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের কর্মী। যদিও দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করার পরও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ছাত্রলীগ কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি ছাত্রীরা কে কোন দলের কর্মী।

এর আগে ১৯ অক্টোবর কবি সুফিয়া কামাল হলে ছাত্রী সংস্থার কর্মী সন্দেহে ২০জন ছাত্রীকে হল থেকে বের করে দেয় প্রশাসন।

সূত্র জানায়, তাদের মধ্যে মাত্র একজন ছাত্রীসংস্থার সঙ্গে জড়িত ছিলো বলে প্রমাণ হয়। তারপরও বাকি ১৯ জনকেও হল থেকে বের করে দেয়া হয়।

একই দিন রাত ৩টায় এ এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিনের অনুসারীরা ৮জন শিক্ষার্থীকে শিবির সন্দেহে আটক করে। মারধরের পর তাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়তায় শাহবাগ থানায় সোপর্দ করে।

পরে সেখান থেকে ১জন শিক্ষার্থী শিবির করে বলে প্রমাণ হয়। বাকি ৭ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়। তবে তাদের কেউই হলে উঠতে পারেনি। সম্প্রতি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে শিবির সন্দেহে মনির ও শওকত নামে প্রথম বর্ষের দুই শিক্ষার্থীকে আটক করে মারধর করে হল সাধারণ সম্পাদক দিদার ও তার অনুসারীরা।

পরে তাদের শাহবাগ থানার পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। মনির শিবির কর্মী হিসেবে প্রমাণিত হলেও শওকত ছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থী। পরে দিদার তাকে থানা থেকে ছাড়িয়ে হলে নিয়ে আসে।

এর আগে ১০ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের প্রত্যয়ন পত্র না নিয়ে আসায় প্রথম বর্ষের ৯৭জন শিক্ষার্থীকে ওই হল থেকে বের করে দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর ৪ শিক্ষার্থীকে শিবির অজুহাতে হাত পেছনে বেধে মারধর করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তবে শিবিরের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সূর্যসেন হলে ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর ছাত্রলীগের পদ না নেয়ায় দুই শিক্ষার্থীকে মারধর করে হলের সাধারণ সম্পাদক সুজন। তবে তারা শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে প্রচার করে হল ছাত্রলীগ। হাত, পা ও চোখ বেঁধে তাদের মারধর করা হয়। ওই দুই শিক্ষার্থীর নাম জাহিদ ও মোস্তাফিজ।

মারাত্মক আহত অবস্থায় তাদের ঢাকা মেড়িকেলে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে তাদের দেখতে যান ভিসি প্রফেসর ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। চিকিৎসা ব্যয় বহন করে হল কর্তৃপক্ষ।

এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ছাত্রদলের সবাই হলে আছে। তাদের কাউকে বের করে দেয়া হয়নি। তারা নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা দিচ্ছেন।

তবে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে কয়েকজনকে বের করে দেয়ার তথ্য আমার কাছে আছে। বের করে দেয়া শিক্ষার্থীরা পরবর্তী হলে উঠতে পারে না এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন ভিসি।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান মোল্লা বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর করা দুঃখজনক। তবে শিবির হলে কোন ধরনের ছাড় দেয়া হবে না।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর প্রফেসর আমজাদ আলী বলেন, বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রথমে ভুল বুঝাবুজি হয় পরে ঠিক হয়ে যায়। তবে কেই মার খাক তা আমরা চাই না।

News source : campuslive24.com

    Blogger Comment
    Facebook Comment