সর্বশেষ খবর:

হকারি করতে লাইসেন্স লাগবে





রাজস্ব আয় বাড়াতে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও ট্রেড লাইসেন্সের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে প্রায় ৫ লাখ হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে বাধ্যতামূলকভাবে লাইসেন্স করতে হবে। যদিও এদের স্থানীয় মাস্তান ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি থেকে সুরক্ষা দিতে কখনোই কোনো উদ্যোগ নেয়নি সিটি করপোরেশন। ডিএসসিসি সূত্র জানায়, সংস্থার এলাকার ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সব ধরনের ব্যবসায়ীকে বৈধ ট্রেড লাইসেন্সের আওতাভুক্ত করতে ও হকারদের নির্দিষ্ট স্থান ও নির্দিষ্ট নিয়মে এনে ব্যবসা পরিচালনা করতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া এর মাধ্যমে ডিএসসিরি রাজস্ব আয়ও বর্তমানের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পাবে। ফলে ডিএসসিসি তার নাগরিকদের সেবার মান ও আওতা বর্তমানের তুলনায় বাড়াতে সক্ষম হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। সূত্র আরো জানায়, ডিএসসিসি এলাকায় গুলিস্তান, মতিঝিল, দিলকুশা, চকবাজার, লালবাগ, নিউমার্কেট, গাউছিয়া, চাদঁনী চক, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা কলেজের সামনে, শাহবাগ, পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানসহ শতাধিক স্থানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো প্রকার বৈধ অনুমতি ছাড়াই নিয়মিত হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করছেন। এদের সংখ্যা হবে প্রায় ৫ লাখ। এদের লাইসেন্সের আওতায় আনা গেলে কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব ট্রেড লাইসেন্সের সর্বনিম্ন ফি (৩০০- ৫০০ টাকা) ধার্য করে এক বছর মেয়াদে দেয়া হবে। তবে সেখানে কিছু শর্তও জুড়ে দেয়া হবে। উল্লেখিত কোনো শর্ত ভঙ্গ করলে তার লাইসেন্স বতিল করা হবে এবং দ্বিতীয়বার ট্রেড লাইসেন্স দেয়া হবে না। তাছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে কোনো শর্ত ভঙ্গ করলে কালো তালিকাভুতক্ত করা হবে এবং ওই ব্যক্তি ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে কর্তৃপক্ষ। তবে অপর একটি সূত্র দাবি করেছে, হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ভাসমান হওয়ায় তাদেরকে প্রাথমিকভাবে অস্থায়ী ভিত্তিতে ও ৬ মাসের জন্য ট্রেড লাইসেন্স দেয়া হবে। নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করছে কি না তা নিয়মিত মনিটর করা হবে। নিয়মিতভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে। হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে বেশিরভাগেরই যেহেতু ঢাকায় কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই সেহেতু তাদের লাইসেন্স গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে তার গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় লাইসেন্স দেয়া হবে। ভবিষ্যতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হলে ওই ঠিকানার উপর নির্ভর করা হবে। এ লক্ষ্যে ট্রেড লাইসেন্স গ্রহনকারীকে অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিতে হবে। স্বাভাবিক নিয়মে কোনো হকার বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে লাইসেন্স দেয়া হয় না। এ কারণে লাইসেন্স বইয়ের ‘অন্যান্য শাখা’য় এ লাইসেন্স দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ডিএসসিসির রাজস্ব শাখার মতে, করপোরেশনের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও ব্যবসায়ীদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে এ উদ্যোগ নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ডিএসসিসি এলাকায় প্রায় ২ লাখ ব্যবসায়ী ট্রেড লাইসেন্সের আওতাভুক্ত রয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ব্যবসায়ীর সংখ্যা এ সংখ্যার চেয়ে কমপক্ষে ৩ গুণ হবে। এ লাইসেন্সবিহীন ব্যবসায়ীদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্যই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে একই ব্যক্তি কয়েকটি ব্যবসা পরিচালনা করলেও একটি মাত্র লাইসেন্স দিয়ে তা পরিচালনা করছেন। এতে করে সিটি করপোরেশন রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অপরদিকে ব্যবসায়ীরাও লাইসেন্সবিহীন অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছে। বেসরকারি এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর ফুটপাতের দোকান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪৬ লাখ ২০ হাজার টাকার মতো চাঁদা আদায় হয়। মাসে ‍হয় ১৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। আবার দোকানের অবস্থান বিক্রি করে মাসে আয় হয় এক কোটি টাকা। বাংলাদেশ হকার্স সমিতির সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে হকার্স স্পট রয়েছে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি। সব মিলিয়ে দিনে প্রায় ৬০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এ হিসাবে মাসে ১৮ কোটি এবং বছরে ২১৬ কোটি টাকা রাজধানীর চাঁদাবাজদের পকেটে যাচ্ছে। এর আগে চাঁদাবাজদের কাছ থেকে হকারদের সুরক্ষা দিতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৎকালীন মেয়র মো. হানিফ। সে আমলে তিনি ওসমানী উদ্যান, মুক্তাঙ্গন, যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, মিরপুর, শাহ আলী, পান্থপথ ও আজিমপুরে মোট আটটি এলাকায় হকারদের পুনর্বাসনের প্রস্তাব করেছিলেন। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মোট ২০টি এলাকায় পুনর্বাসনের প্রস্তাব করা হয়। তখন প্রস্তাবগুলোর কিছু কিছু বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেগুলোও আর কার্যকর নেই। সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার রাস্তাগুলোর ফুটপাতে দোকান আছে ৭৫ হাজারের মতো। তবে বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী দোকানের সংখ্যা ২ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) অপর এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতিমাসে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ফুটপাতগুলোতে অবস্থাররত হকাররা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ক্যাডারদের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে থাকেন। সিটি করপোরেশন যদি এদের ট্রেড লাইসেন্সের ব্যবস্থা করতো তাহলে এ টাকা করপোরেশনের রাজস্ব হিসেবে আয় হতো। এ বিষয়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ডিএসসিসির নগর ভবনের সভাকক্ষ্যে এক আলোচনা সভায় ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের (ডাব্লিউবিবি) ন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি অফিসার মারুফ রহমান সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনছার আলী খানকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘প্রতিমাসে রাজধানীর হকার্সরা ৩শ কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে থাকে। যদি করপোরেশন এসব হকারদের জন্য নির্ধারিত একটি আইডি কার্ড অথবা রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করতো তাহলে টাকাগুলো রাজস্ব হিসেবে আয় করা যেতো।’ তার এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছি। এর মাধ্যমে হকার্সদেরকে একটি নিয়মের মাধ্যমে আনা সম্ভব হবে। তাছাড়া সংস্থার রাজস্বও বৃদ্ধি পাবে।’
    Blogger Comment
    Facebook Comment