
দেশের বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য শিক্ষক নেই। কোনো কোনোটিতে শিক্ষক নেই বললেই চলে। কর্তৃপক্ষ না পড়িয়ে এবং পরীক্ষা না নিয়েই শিক্ষার্থীদের সনদ দিয়ে থাকে। শিক্ষার মান উন্নয়নে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ বাতিল করে দিতে হবে।
বাংলাদেশের পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশল-বিষয়ক শিক্ষা শীর্ষক সেমিনারে আজ শনিবার আলোচকেরা এসব কথা বলেন।
আলোচকেরা বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। তারা ইউরোপে ছাত্র পাচার ঠেকিয়েছে। তাই দেশের উন্নয়নে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতা বাড়াতে হবে এবং তাদের শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে। একইভাবে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশল-বিষয়ক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্সের সেমিনার কক্ষে ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স (আইইবির) এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, চার ধরনের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো ফল করছে। দ্বিতীয় সারিরগুলো মোটামুটি। তৃতীয় সারির বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য শিক্ষা বিতরণ নয়, টাকা আয় করা। চতুর্থ সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই, পড়াশোনা হয় না। তারা পরীক্ষা না নিয়েই সনদ বিতরণ করে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়ে থাকে। কিন্তু তারা কী শিক্ষা দিচ্ছে, তা ইউজিসি পর্যবেক্ষণ করে না।
আইনুন নিশাত বলেন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমে সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাস পড়ার সুযোগ নেই। যে কারণে প্রকৌশলীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা ও দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কিত ধারণার অভাব রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রকৌশল বিদ্যার পাঠ্যক্রমে এ দুটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, বেসরকারি ৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আংশিক নিবন্ধন শর্ত পূরণ করেছে। ২৮টিকে আমরা নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে বাধ্য করেছি। দারুল ইহসানসহ বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় সনদ বাণিজ্য করে। গত ২০ বছরে তারা কোটি কোটি টাকা বানিয়েছে। এর মধ্যে ১৫টির নিবন্ধন বাতিল করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হবে। কারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর টাকা সরকারের নেই। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিংয়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়। কোটিপতির সন্তানেরা জানে, কোথায় পড়লে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যাবে। যে কারণে এখন গরিব মেধাবী ছাত্রটি বাপের জমি বিক্রি করে বেসরকারিতে পড়ছে।
অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সনদ বিক্রি করে, ছাত্ররা পরীক্ষা না দিয়ে সনদ নিচ্ছে—এ বিষয়ে সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আবার বিদেশে ছাত্র পাচার ঠেকিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, সেটাও সরকার স্বীকার করে না। কিন্তু দেশের উন্নয়নে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বাড়াতে হবে।
বুয়েটের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পাস করে কী করছে, সেটা প্রতি পাঁচ বছর পর সরকারিভাবে জরিপ করা উচিত। তাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ তাদের শিক্ষার মান বাড়াতে বাধ্য হবে।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ হোসেন বলেন, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় শতাধিক। কিন্তু সে তুলনায় কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই বললেই চলে। ভালো শিক্ষকও নেই। এভাবে চলতে পারে না। এ বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের আগে তাদের কলেজ পরিচালনার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা উচিত।
পানি বিশেষজ্ঞ এস আই খান বলেন, দেশের লেদার টেকনোলজি ও গার্মেন্টসে বিদেশিরা কারিগরি বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন। এর অর্থ এ দেশে যোগ্য প্রার্থী তৈরি হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে চাহিদা যাচাই করে জনশক্তি তৈরি করতে হবে।
আইইবির প্রেসিডেন্ট শামীম-উজ-জামানের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির উপাচার্য রেজোয়ান খান ও ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আলাউদ্দিন।
Blogger Comment
Facebook Comment