সর্বশেষ খবর:

অজগরের সঙ্গে বসবাস



মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম সাপ। সাপ দেখলে সহজে কেউ কাছে যেতে চায় না। আর সাপের সঙ্গে বসবাসতো রীতিমতো অসম্ভব একটি ব্যাপার। আর যদি সাপটির নাম হয় অজগর, তাহলে তো কথাই নেই। এমন সব ধারণাকে একেবারেই মিথ্যে প্রমাণ করে নিজের সন্তানের মতোই দীর্ঘ নয়টি বছর ধরে একটি অজগরকে সযত্নে লালনপালন করছেন রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলার বাসিন্দা ভিডিপির হাবিলদার সাদেক আলী ওরফে সাদিম।

নয় বছর ধরে অজগরের বাচ্চাটিকে আদর যত্ন দিয়ে বড় করে তুলছেন সাদেক আলী। প্রায় ১০ ফুট লম্বা এই অজগর সাপটির সঙ্গে রীতিমতো গভীর সখ্য গড়ে উঠেছে তার। সাদেক আলীর ভালোবাসায় বড় হওয়া অজগর সাপটিকে সে ছাড়া আর কেউ কোনো কিছু খাওয়াতে পারে না। সাদেক আলীর কথামতো মুখে চুম্বনও দেয় নয় বছর বয়সী বিশাল আকৃতির এই অজগর সাপটি। জন্ম জঙ্গলে হলেও অজগরটি এখন জঙ্গলে থাকতে চায় না। জঙ্গলে ছেড়ে দিলে অজগরটি নিজ থেকেই ফিরে আসে সাদেক আলীর বাসায়। সেখানেই মানুষের সাহচার্যে থাকতে ভালোবাসে। এই বয়সে একটি জংলি অজগর সাপ বড় বড় পশুপ্রাণী খেয়ে ফেলতে সক্ষম হলেও সাদেক আলীর অজগরটি প্রতি দুই দিনে এক থেকে দুই কেজি মাছ খেয়েই কাটিয়ে দেয় সারাদিন।

সরেজমিনে সাদেক আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এক একর জায়গার উপর একটি কাঠের ঘেরা বসতঘর ও বাঁশের বেড়া দেওয়া একটি রান্নাঘর। আর বাড়ির উঠানে রয়েছে কাঠ দিয়ে তৈরি ছোট্ট দুটি ঘর। যার একটিতে থাকে মুরগি ও অপরটিতে তিনটি অজগর সাপ। বাড়িতে ঢুকতেই দেখা গেল তিনটি অজগর মাথা তুলে চারদিক দেখছে। এখন খাবারের সময়, ওরা তাই অপেক্ষা করছে সাদেকের জন্য। খানিক পরেই তিনি এলেন মাছ নিয়ে। অজগরটিকে দিতে শুরু করলেন মাছ। তিনি মুখে তুলে না দিলে সাপগুলো খায় না।

সাপুড়ে না হয়েও কীভাবে পোষ মানালেন সাপগুলোকে? এমন প্রশ্নের জবাবে সাদেক আলী বলেন, শখের বশেই তার সাপ লালনপালনের শুরু। বাসায় রান্নার কাঠ জোগাড় করতে ঘুরতেন পাহাড়ে পাহাড়ে। তখন দেখতেন অনেকে সাপ ধরে নিয়ে যাচ্ছে খাওয়ার জন্য। মায়া হলো তার। কিছু একটা করার কথা ভাবলেন। এভাবেই কাটতে লাগল দিন। ১৯৮৪ সালের কথা। একদিন পাহাড়ে কাঠ আনতে গিয়ে চোখের সামনে পড়ল একটা শঙ্খিনী সাপ। ভয়ডর ভুলে প্রায় সাড়ে তিন হাত লম্বা সাপটিকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন বাড়িতে। পরম ভালোবাসায় পুষতে শুরু করলেন সাপটিকে। ইচ্ছে ছিল ডিম ফুটিয়ে বংশ বাড়িয়ে আবার জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু পারলেন না বেশিদিন। তিন মাসের মাথায় পরিবারের চাপের মুখে সাপটিকে ছেড়ে দিয়ে আসতে হয় জঙ্গলে। একবার চেষ্টা করেও পারলেন না। কিন্তু দমে গেলেন না। একদিন বনে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে পেয়ে গেলেন প্রায় ১০ কেজি ওজনের একটি অজগর। অসম্ভব জেদি ছিল এটি। অনেক কৌশলে সঙ্গে নিয়ে আসেন বাসায়। অতি যত্নে লালন-পালন করতে শুরু করেন। কিন্তু বনের সাপকে পোষ মানানো কি এত সহজ! অজগরটি একের পর এক বাড়ির মুরগি খাওয়া শুরু করল। তবু হাল ছাড়েননি। সাপটিকে দিতে শুরু করলেন মাছ। ১৯৯৯ সালের কথা। একদিন বাজার ঘুরেও মাছ পেলেন না। এদিকে মামলার কাজে তাকে যেতে হবে চট্টগ্রাম। কয়েকদিন তিনি থাকবেন না। সাপটিও না খেয়ে থাকবে, এই ভেবেই খাওয়ালেন পাঁচ কেজি গরুর মাংস। চট্টগ্রাম গিয়ে খবর পেলেন সাপটি বাসা ভেঙে পালিয়েছে।

প্রায় নয় বছর আগের কথা। লংগদুর সিজক পাহাড় থেকে আবারও তিনি ধরে আনলেন অজগর সাপের একটি বাচ্চা। সাপটি মেয়ে হলেও সাদেক তার নাম দেন বুশ। ঠিক নিজের সন্তানের মতো করেই বুশকে বড় করেছেন সাদেক। নয় বছর বয়সেও এখনো ধরে ধরে খাইয়ে না দিলে খেতে পারে না বুশ। চার-পাঁচ বছর আগে বন থেকে একটি পুরুষ অজগর ধরে আনেন তিনি। সেটিকে ছেড়ে দেন বুশের সঙ্গে। ছেলে সাপটির নাম দেওয়া হয় সাদ্দাম।
সাদ্দাম কিছুদিন পর খাঁচা ভেঙে পালালেও বুশ এক সময় ১৮টি ডিম পাড়ে। চলতে থাকে ডিমসহ বুশের পরিচর্যা। এক সময় ১১টি ডিম ফুটে বের হয় বাচ্চা। এর মধ্যে আটটি সাপের বাচ্চাকে ছেড়ে দিয়ে আসেন কালাপাহাড়ে। এরপর বুশ ও তার তিন বাচ্চাকে লালনপালন শুরু করেন সাদেক। কিছুদিন পর মাছ কেনার টাকা জোগাড় করতে না পেরে দুটি বাচ্চাকে ছেড়ে দেন পাহাড়ে। বর্তমানে বুশ ও তার ছানা ছাড়াও আরও একটি অজগর কিনে লালন-পালন করছেন। এর মধ্যেই সাদেক আলী লংগদু রেঞ্জের বন বিভাগের হাতে তুলে দিয়েছেন তিনটি সাপ।

সাদেক আলী চাইলে সাপ দিয়ে খেলা দেখিয়ে আয় করতে পারতেন প্রচুর অর্থ। কিন্তু এ সবে কোনো লোভ নেই তার। বর্তমানে কাজ করছেন ভিডিপিতে হাবিলদার হিসেবে। সেই সঙ্গে করছেন টুকটাক চিড়াই কাঠের ব্যবসা। ভয়ঙ্কর প্রাণী সাপের প্রতি অন্যরকম ভালোবাসা থাকলেও সংসারমুখী সাদেক। স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই মেয়েসহ সুখের সংসার তার। তবে তার একটাই দুঃখ তার পরিবারের পক্ষ থেকে সাদেকের সাপ পালনে সহযোগিতা করে না এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড সহ্যও করে না।

স্ত্রী আর বাচ্চারা ঘরে না থাকলে বুশকে বিছানায় নিয়ে রাতে গল্পও শোনান সাদেক আলী ওরফে সাদিম।
সাদেক আলী এই প্রতিবেদককে জানান, সাপ যত ভয়ঙ্কর হোক না কেন, ইচ্ছে থাকলেই তাকে পোষ মানানো সম্ভব। ভবিষ্যতে আরও বড় সাপের খামার করার স্বপ্ন দেখেন। আর এই জন্য সাদেকের আশা, সরকার যদি তাকে একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত, তাহলে পাহাড় থেকে বিলুপ্ত হতে চলা বিভিন্ন প্রজাতির সাপ সংরক্ষণে তিনি অবদান রাখতেন।

সাদেক আলীর এমন কর্মকাণ্ডে গর্ববোধ করেন বলে জানালেন লংগদু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন। বিলুপ্ত হতে চলা অজগর সংরক্ষণে সাদেক আলীর কর্মকাণ্ডে লংগদু উপজেলাবাসী গর্বিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি এই অর্থবছরে বরাদ্দ এলে সাদেক আলীকে কিছু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিব। যাতে করে এই সাপগুলোকে ভালোভাবে কিছু খাবার দিতে পারে এবং লালনপালন করতে পারে। এ ছাড়া যদি সম্ভব হয় তাকে একটি ঘর করে দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

    Blogger Comment
    Facebook Comment