সর্বশেষ খবর:

ঢাবির সেইফ হোমে যা ঘটছে…

সেইফ হোম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরিচিত নাম। কেউ বলেন গেস্ট রুম। কেউবা বলেন সেইফ হোম। তবে নবাগত শিক্ষার্থীরা বলেন ভিন্ন কথা। তারা সাফ জানিয়েছেন, আসলে সেইফ হোম নয়, এটা টর্চার সেল। এ শব্দটির সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা দীর্ঘ দিন ধরেই পরিচিত। নির্যাতন নিরবেই সইতে হয়। মুখ খুলে প্রতিবাদ তো দূরের কথা চোখে চোখ রেখেও কথা বলা যায় না।

এই অনিয়মটি যেন নিয়মেই পরিচিতি পেয়েছে। তারা জানিয়েছেন, কেবল হলে থাকার জন্যই এসব কিছু চোখ বুজে মেনে নিতে হচ্ছে। নিয়মিত হাজিরা দেয়া, সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা, মিছিল-সমাবেশে যোগদান, তুই-তোকারি এসব নিয়মিত ঘটনা।

দেরি করছিস কেন? প্রতিদিন ডাকতে হবে? মিছিলে আসলি না কেন? হাজিরা দিতেও ডাকতে হবে? এভাবেই নবাগত শিক্ষার্থীরা মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন হর-রোজ। শুধু একাল নয়, সেকালেও এমনটি ঘটেছিল। মানে কেবল ছাত্রলীগ নয়, ছাত্রদলও এভাবেই নবাগতদের নানান ভাবে শাসিয়ে ও দাঁড় করিয়ে রেখে সময় গুজরান দিয়েছে।

ভুক্তভোগিরা কেউ নিজের পরিচয় দিতে রাজি না হলেও তাদের কষ্টের নানান ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এই প্রতিবেদকের কাছে। সলিমুল্লাহ মুসিলিম হলের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের ২য় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, গেস্টরুমে যা হয় তা আপনার সাতে বলে সমাধান কি?, গেস্ট রুমের নামে সেখানে আমদের রাতে পড়াশোনা করার গুরত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করা হয়।

২-৩ ঘণ্টা সেখানে থাকলে আর পড়াশোনা করবো কখন? সেখানে শেখার কিছু থাকতো তাও হত। শুধু সেখানে এ কাজ সে কাজ জিজ্ঞাসাবদের নামে মানসিক নির্যাতন। কারন আমাকে হলে থেকে পড়াশোনা করতে হবে। বাইরে থাকার টাকা থাকলে চলে যেতাম। ভাবছি একটা টিউশানি পাইলে হল ছেড়ে দেব।

কবি জসীম উদ্দিন হলের ইতিহাস বিভাগের ১ম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ায় এলাকার মানুষের কাছে খুবই সম্মানিত হয়েছি। কিন্তু প্রথম দিন হলে উঠার পর রাতে গেস্টরুমে ডাকা হয়। সময় মতো না গেলে হল থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়।

বড় ভাইদের কথা মতো যথা সময়ে গেস্টরুমে যাই। যাওয়ার ৫ মিনিট পরেই বড় ভাইরা গেস্টরুমে প্রবেশ করে। পরে এক করে সকলকে বিভিন্ন দুর্বোধ্য প্রশ্ন করতে থাকে। উত্তর দিতে একটু বিলম্ব করলেই কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিস, তোরা সবাই ধইঞ্চা নাকি ইত্যাদি আপত্তিকর কথা বলে নিজেরা হাসা হাসি করে।

মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের মেহেদী হাসান নামে এক সিনিয়র শিক্ষার্থী বলেন, গেস্ট রুম আপেক্ষিক অর্থে যদিও খারাপ মনে হয় তারপর ভালো। কারণ একজন শিক্ষার্থী যখন গ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভর্তি তখন সে অনেক কিছুই বুঝেনা। গেস্টরুমের মাধ্যমে তাকে বিভিন্ন নিয়ম কানন শিখানো হয়। তাছাড়া গেস্টরুম না করালে জুনিয়াররা সিনিয়রদেরকে মান্য করতো না।

আবু বকর নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, আমরাও হলে গেস্টরুম করেছি। ১ম কয়েকদিন নিজের কাছে খারাপ লাগে পরে আর সমস্যা হয় না।

জানা যায়, হলগুলোর শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক নিয়মিত কাজের মধ্যে ৩-৪ দিন ( বিশেষ প্রেক্ষাপটে প্রতিদিন) গেস্টরমে নেতাদের সামনে ২-৩ ঘন্টা সময় ধরে হাজিরা দেয়া অন্যতম। গেস্টরুমে সৌজন্যতা শেখানোর নামে শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো হয় মানসিক কখন ও শারীরিক নির্যাতন।

প্রথমে সবাইকে সারিবদ্ধভাবে দাড় করিয়ে এক এক শূরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। আজকে মিছিলে গিয়েছিলি?, হল গেটে থাকতে বলেছিলাম ছিলি?, ওখানে যাসনি কেন?, আর গেস্টরুমের টাইম জানিস না প্রতিদিন ডাকতে হয় ক্যান?,ওকে চিনিস না?, হলে থাকতে হলে ভালো হয়ে থাকবি। আর কাল সকাল ৭টাই হল গেটে সবাই থাকবি কারো ছাড় দেওয়া হবে না, ইত্যাদি তুই-তামারি করে ধমকানো হয় কিছুক্ষন।

আবার উত্তরের সময় শারীরিক অঙ্গভঙ্গি কোন কোন প্রকারের বিচ্যুতি ঘটলে শুরু হয় গেস্টরুমের অগ্নি পর্ব। কান ধর উঠবস কর অথবা আজ রাত হলে থাকতে পারবিনা। কারো বিরুদ্ধে কোন প্রকারের অভিযোগ পেলে শাস্তি দেওয়া হয় কখন ও হল থেকে বের করে দেওয়া হয়।

সিনিয়রদের প্রতি অতিরিক্ত সৌজন্যতাবোধ আবার কাল হয়ে পড়ে কারো। তাদের অনেক সময় বিরোধী সন্দেহে পুলিশে সোপর্দ করা বা হল থেকে বের করা হয়। আর গেস্টরুমের এমন নিয়ম সকলেই মেনে নিতে বাধ্য কারণ একটাই গণরুমে থাকার জায়গাটা যেন হাত ছাড়া না হয়ে যায়।

সূত্র -ক্যাম্পাসলাইভ২৪


    Blogger Comment
    Facebook Comment